সিলেট প্রতিক্ষণ



নিজস্ব প্রতিবেদক

অগাস্ট / ০৪ / ২০২৬


ভারত থেকে আমদানি, ‘সিলেটের সাতকরা’ নামে বিক্রি


56

Shares

লেবুজাতীয় ফল সাতকরা। এর স্বতন্ত্র সুগন্ধ ও তীব্র স্বাদের কারণে ভোজনরসিকদের কাছে এটি এক অনন্য উপাদান। বিশেষ করে সাতকরা দিয়ে গরু বা খাসির মাংস রান্না সিলেটের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে পরিচিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও সিলেটে এলে সাতকরা দিয়ে রান্না করা গরুর মাংসের স্বাদ নিতে চান।

অথচ যে সাতকরাকে সিলেটের পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়, সেই ফল এখন প্রায় পুরোপুরিই আসে ভারত থেকে। শুধু দেশের বাজারই নয়, ভারতের সাতকরাই আবার 'সিলেটি সাতকরা' পরিচয়ে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

সিলেটে উৎপাদন প্রায় শূন্যের কোঠায়

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে কেবল সিলেট জেলায় মাত্র এক হেক্টর জমিতে সাতকরার আবাদ হয়েছে। সেখান থেকে উৎপাদন হয়েছে মাত্র এক মেট্রিক টন। অন্য তিন জেলায় কোনো উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক উৎপাদনের তথ্যই নেই।

অথচ কয়েক দশক আগেও সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে সাতকরা গাছ দেখা যেত। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার ‘সাতকরাকান্দি’ গ্রাম একসময় এই ফলের জন্য পরিচিত ছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য, এখন সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি গাছ ছাড়া আর তেমন কোনো উৎপাদন নেই।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, রোগবালাই, দীর্ঘ সময় ধরে ফল আসা এবং কৃষকদের অনাগ্রহের কারণে বাণিজ্যিকভাবে সাতকরা চাষ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

ভারতের পাহাড় থেকে সিলেটের বাজারে

বর্তমানে সিলেটের বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ সাতকরা আসে ভারতের আসাম, মেঘালয় ও মিজোরাম রাজ্য থেকে। সীমান্ত দিয়ে আমদানির পর সেগুলো সিলেটের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে আসে। এরপর দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। এর একটি অংশ আবার প্রবাসীদের চাহিদা মেটাতে বিদেশেও রপ্তানি করা হয়।

অর্থাৎ, উৎপাদন ভারতে হলেও বাজারে এটি পরিচিতি পাচ্ছে ‘সিলেটি সাতকরা’ হিসেবে।

লোকসানে কমছে আমদানি

গত বছর ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের লোকসান হওয়ায় এবার আমদানিও কমে গেছে। সিলেট নগরের বন্দরবাজার, আম্বরখানা ও কদমতলী এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সাতকরার সরবরাহ অনেক কম। যেগুলো পাওয়া যাচ্ছে সেগুলোর বেশিরভাগই আকারে ছোট এবং পুরোপুরি পরিপক্ব নয়। মানভেদে প্রতিটি সাতকরা ৪০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও দাম আরও বেশি।

ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণত কোরবানির ঈদের আগে ভারত থেকে প্রচুর সাতকরা আসে। কিন্তু এবার আমদানি কম হওয়ায় বাজারে সংকট তৈরি হয়েছে।

‘ঐতিহ্য ধরে রাখতেই ব্যবসা করছি’

কদমতলী ফল বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী সুজন মিয়া বলেন, ‘বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বস্তা সাতকরা ভারত থেকে আসে। প্রতি কেজিতে সরকারকে ৭৬ টাকা কর দিতে হয়। পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ করলে বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, লোকসানই হচ্ছে।’

তার ভাষ্য, ‘সিলেটের ঐতিহ্যের কারণে এখনও কয়েকজন ব্যবসায়ী এই পণ্য আমদানি করছেন।’

একসময় ছিলেন পাঁচজন, এখন আছেন একজন-দুজন

সাতকরা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. নাজমুল আলম লিজন বলেন, ‘এখন সিলেটের সাতকরা বলতে কিছু নেই বললেই চলে। ভারতের আসাম, মিজোরাম ও মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর সাতকরা উৎপাদন হয়। আমরা সেখান থেকেই আমদানি করি।’

তিনি বলেন, ‘আগে চার-পাঁচজন বড় ব্যবসায়ী এই ব্যবসা করতেন। কিন্তু টানা লোকসানের কারণে এখন একজন-দুজন ছাড়া সবাই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।’

'সিলেটের ব্র্যান্ড, কিন্তু উৎপাদন ভারতের'

সিলেটের খাদিমনগর হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. রকিবুল ইসলাম রুমন বলেন, ‘সিলেটে যেটিকে সাতকরা বলা হয়, তার বড় অংশই ভারত থেকে আসে। জকিগঞ্জ সীমান্তের ওপারে ভারতের করিমগঞ্জ এলাকায় বিশাল সাতকরার বাগান রয়েছে। কিন্তু আমাদের সিলেটে সেই ধরনের কোনো বাণিজ্যিক বাগান নেই।’

তিনি জানান, জৈন্তাপুরের সাইট্রাস রিসার্চ ইনস্টিটিউট সাতকরা নিয়ে গবেষণা করছে। ব্যক্তিগত পর্যায়েও কিছু গাছ লাগানো হয়েছে। তবে গাছের বৃদ্ধি ধীর এবং এখনো ফল আসেনি।

কৃষি বিভাগের উদ্বেগ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘একসময় সাতকরা ছিল সিলেটের গর্ব। কিন্তু এখন এর বাণিজ্যিক উৎপাদন প্রায় বিলুপ্ত। বাজারের চাহিদা পুরোপুরি ভারতীয় সাতকরার ওপর নির্ভরশীল।’

তিনি বলেন, ‘বাজারে যে সাতকরা বিক্রি হচ্ছে, তার একটি অংশ আবার 'সিলেটি সাতকরা' পরিচয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।’

ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে উৎপাদন বাড়ানোর দাবি

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, সাতকরা শুধু একটি ফল নয়, এটি সিলেটের খাদ্যসংস্কৃতি ও আঞ্চলিক পরিচয়ের অংশ। কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার কারণে এই ঐতিহ্য এখন পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে।

তাদের মতে, গবেষণা, উন্নত চারা উৎপাদন, কৃষকদের প্রণোদনা এবং বাণিজ্যিক বাগান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে 'সিলেটি সাতকরা' শুধু নামেই টিকে থাকবে, বাস্তবে নয়।

সিলেট প্রতিক্ষণ