71
Sharesসুরমা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দূরে তাকালে দেখা যায়, মাঝনদীতে নিশ্চিন্তে ভেসে বেড়াচ্ছে কয়েকটি মাছ ধরার নৌকা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, দিনের অন্যসব জেলের মতোই তারা জীবিকার সন্ধানে নেমেছেন। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, সব নৌকাই মাছ ধরতে নামে না। কিছু নৌকা নদীর বুকেই অপেক্ষা করে আরেকটি 'চালানের' জন্য। ওপার থেকে ভেসে আসে বিশেষভাবে মোড়ানো একটি প্যাকেট। নির্ধারিত সংকেত মিললেই সেটি তুলে নেওয়া হয়। পরে শুরু হয় আরেক যাত্রা, গন্তব্য দেশের বিভিন্ন জেলা।
এই সীমান্তে ইয়াবাকে কেউ 'ইয়াবা' বলে না। এখানে তার পরিচয় 'বিচি', 'বোতাম' কিংবা 'মাল'। এই সাংকেতিক ভাষার আড়ালেই দিনের পর দিন চলেছে কোটি টাকার মাদক বাণিজ্য।
ভারত সীমান্তঘেঁষা সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট এখন ইয়াবা পাচারের অন্যতম সক্রিয় রুটে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিয়মিত চালান ধরা পড়লেও মূল নিয়ন্ত্রকেরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। আটক হচ্ছেন মূলত বাহক বা পরিবহনকারী।
বদলেছে কৌশল, বদলায়নি ব্যবসা
স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে এই সীমান্ত জিরা, কসমেটিকস ও অন্যান্য ভারতীয় পণ্যের চোরাচালানের জন্য বেশি পরিচিত ছিল। সেই আড়ালেই ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ইয়াবা পাচারচক্র।
বিজিবির কঠোর নজরদারির কারণে সম্প্রতি পুরোনো কৌশল কিছুটা বদলেছে। কিন্তু মাদক আসা বন্ধ হয়নি।
একাধিক স্থানীয় সূত্র জানায়, জকিগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রী ইউনিয়নের জিরো পয়েন্ট থেকে কসকনকপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত সুরমা-কুশিয়ারা নদীবেষ্টিত সীমান্ত এখন ইয়াবা পাচারের অন্যতম করিডোর।
দিনের বেলায় জেলের ছদ্মবেশে সীমান্তের ওপার থেকে চালান সংগ্রহ করা হয়। ভারতের অংশ থেকে জলরোধী বিশেষ মোড়কে ইয়াবা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। আগে থেকেই নির্ধারিত চিহ্ন দেখে বাংলাদেশের অংশে থাকা সহযোগীরা মাঝনদী থেকে সেই প্যাকেট উদ্ধার করেন।
রাতের বেলায় কৌশল আরও ভিন্ন। কখনও সাঁতরে, কখনও সীমান্তের কাঁটাতারের ফাঁক গলে দেশে ঢোকানো হয় ইয়াবা। এরপর সীমান্তবর্তী নিরাপদ জায়গায় অস্থায়ীভাবে মজুত রাখা হয়।
ছদ্মনামে চলে কোটি টাকার কারবার
স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, মাদক কারবারিরা কখনও প্রকাশ্যে 'ইয়াবা' শব্দটি ব্যবহার করেন না।
চালান আদান-প্রদানের সময় তারা 'বিচি', 'বোতাম' কিংবা 'মাল' শব্দ ব্যবহার করেন। ফোনালাপ থেকে শুরু করে সামনাসামনি কথাবার্তায়ও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ানো যায়।
সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে
স্থানীয়দের দাবি, সীমান্ত অতিক্রমের পর প্রথমে চালান যায় স্থানীয় বাহকদের কাছে। পরে জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারের নির্দিষ্ট কয়েকটি পয়েন্টে বড় কারবারিদের প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এরপর বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা অন্যান্য গণপরিবহনে সাধারণ যাত্রীর ছদ্মবেশে ইয়াবা পৌঁছে দেওয়া হয় দেশের বিভিন্ন জেলায়।
ঝুঁকি অনুভব করলে বাহক পরিবর্তন, পোশাক বদল কিংবা রুট পরিবর্তনের মতো কৌশলও নেওয়া হয়। ফলে গোয়েন্দা তথ্য থাকলেও অনেক সময় মূল চালান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ধরা পড়ছে চালান, অধরাই মূলহোতা
গত জুন মাসেই জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার এলাকায় একাধিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে।
১৩ জুন বিয়ানীবাজার উপজেলার দুবাগ ইউনিয়নের পাঞ্জিপুরী এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালিয়ে ৯ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়।
১৫ জুন জকিগঞ্জ উপজেলার মানিকপুর ইউনিয়নের শাহজালালপুর এলাকায় গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে এক হাজার পিস ইয়াবা ও একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। তবে অভিযানের সময় দুই বাহক পালিয়ে যান। এরপর ২৫ জুন জকিগঞ্জ-শেওলা সড়কের খলাছড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় এক হাজার ৯০০ পিস ইয়াবা। সবশেষ ২৯ জুন মানিকপুর ইউনিয়নের খাসেরা এলাকায় আরও ৪০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে জকিগঞ্জ থানা পুলিশ।
তবে এসব অভিযানে যারা আটক হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই বাহক বলে দাবি স্থানীয়দের। একাধিক সূত্র বলছে, ভারত থেকে সীমান্ত পার করানো থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন নির্দিষ্ট কয়েকজন সিন্ডিকেট প্রধান। তারা খুব কমই নিজেরা চালান বহন করেন। সফল প্রতিটি চালানের বিপরীতে বাহকদের নির্ধারিত পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।
পুলিশ যা বলছে
সিলেটের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মোহাম্মদ যাবের সাদেক বলেন, 'মাদকের বিরুদ্ধে আমরা সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছি। গত মাসে জকিগঞ্জ থেকে প্রায় ১০ হাজার এবং বিয়ানীবাজার থেকে ৯ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।'
তার মতে, শুধু বাহক নয়, মাদক কারবারিরাও পুলিশের নজরদারিতে রয়েছেন। 'মাদকের চালানের সঙ্গে শুধু বাহক ধরা পড়ছে, বিষয়টি এমন নয়। যারা কারবারি, তারাও আটক হচ্ছেন। এছাড়া তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের বিষয়ে আমাদের নিয়মিত নজরদারি রয়েছে।'
তবু রয়ে গেছে বড় প্রশ্ন
প্রায় প্রতি মাসেই সীমান্ত থেকে ইয়াবার চালান উদ্ধার হচ্ছে। নিয়মিত গ্রেপ্তারও হচ্ছে। কিন্তু তারপরও কেন থামছে না ইয়াবার প্রবেশ? স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি বারবার একই সীমান্ত দিয়ে চালান আসে, তবে সেই নেটওয়ার্কের মূল নিয়ন্ত্রকেরা কারা? আর কেন তারা বছরের পর বছর অধরাই থেকে যাচ্ছেন?
জকিগঞ্জ সীমান্তে এখন এই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজছে স্থানীয় মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
আরসি-০১