সিলেট প্রতিক্ষণ



নিজস্ব প্রতিবেদক

অগাস্ট / ০৮ / ২০২৬


সিলেটে প্রবাসী-পাত্রের মোহে বিয়ে, দূরত্বে ভাঙছে সংসার


69

Shares

বিয়ের পর স্বামী চলে গেছেন বিদেশে। শুরুতে ফোনে কথা, ভিডিও কলে সংসারের খোঁজখবর। মেয়েটির চোখে তখন নতুন জীবনের স্বপ্ন। একদিন স্বামী তাকে বিদেশে নিয়ে যাবেন, সংসার হবে স্বচ্ছল, বদলে যাবে জীবন। কিন্তু সেই অপেক্ষা কখনো শেষ হয় না। মাস যায়, বছর যায়। স্বামী দেশে ফেরেন না। কখনো যোগাযোগ কমে যায়, কখনো আসে বিচ্ছেদের বার্তা। কোথাও আবার বিদেশে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিয়ের পরই শুরু হয় প্রতারণা।

সিলেট অঞ্চলে প্রবাসী-পাত্রের প্রতি পরিবারের অতিরিক্ত আগ্রহ এবং বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নকে কেন্দ্র করে এমন বিয়ের সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে দীর্ঘদিনের দূরত্ব, পারিবারিক চাপ, অর্থনৈতিক প্রতারণা ও দাম্পত্য জীবনে মানিয়ে নিতে না পারা। সব মিলিয়ে ভাঙছে একের পর এক সংসার।

সিলেট জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য বলছে, গত এক বছরে জেলায় ২০ হাজার ৪৮৫টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। এর বিপরীতে ২ হাজার ৫৩২টি তালাক নিবন্ধিত হয়েছে।

সিলেট সিটি করপোরেশনের তথ্যেও বিচ্ছেদের প্রবণতা বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৪ সালে সিটি করপোরেশনে ৩১৩টি তালাকের আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে পুরুষের আবেদন ছিল ১৪২টি এবং নারীর ১৭১টি।

২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪৫টিতে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে স্বামীর পক্ষ থেকে আবেদন করা হয় ২৫২টি এবং স্ত্রীর পক্ষ থেকে ২৯৩টি।

চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই তালাকের আবেদন জমা পড়েছে ২৬৪টি। অর্থাৎ বছরের বাকি ছয় মাস বাদ দিয়েই সংখ্যাটি আগের বছরের মোট আবেদনের প্রায় অর্ধেক।

তালাকের আবেদনকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা বেশি হওয়াও পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিয়ের পেছনে প্রবাসী হওয়ার হিসাব

সিলেটের সামাজিক বাস্তবতায় প্রবাসী পাত্রের আলাদা কদর রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে সিলেটের বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করছেন। ফলে অনেক পরিবারের কাছে প্রবাসী পাত্র মানেই আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং মেয়ের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা।

কিন্তু বিয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় ছেলে-মেয়ের ব্যক্তিগত পছন্দ, মানসিক প্রস্তুতি কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চেয়ে প্রবাসী পরিচয়ই হয়ে উঠছে প্রধান বিবেচনা।

কাজী সমিতি সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল, 'একটি বিয়ে টেকসই হওয়ার জন্য দুজন মানুষের মানসিক প্রস্তুতি, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্মতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক পরিবার বিদেশে থাকা পাত্রের পরিচয়কে এত বেশি গুরুত্ব দেয় যে, পাত্র-পাত্রীর নিজেদের মতামত ও সামঞ্জস্য যাচাই করার বিষয়টি পিছনে পড়ে যায়।'

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী ওয়াক্কাস বলেন, 'একজন পরিণত ছেলে ও একজন পরিণত মেয়ে যখন বিয়ের উপযুক্ত হয়, তখন তাদের মতামতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কিন্তু মেয়েদের বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে অনেক পরিবারের মধ্যে বিয়ের মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। পরে বিদেশে গিয়ে অনেকেই নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না।'

বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন, বাস্তবে দীর্ঘ অপেক্ষা

প্রবাসী পাত্রকে বিয়ে করার পর অনেক নারী স্বামীর সঙ্গে বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ না হলে শুরু হয় অনিশ্চয়তা।

কেউ কেউ বিয়ের পর বছরের পর বছর দেশে থেকে যান। স্বামী বিদেশে থাকায় সংসার কার্যত শ্বশুরবাড়ির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কোথাও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়। আবার কোথাও বিদেশে থাকা স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগই ধীরে ধীরে কমে আসে।

সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এপিপি অ্যাডভোকেট আয়েশা বেগম শেলি বলেন, 'দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রীর আলাদা থাকা দাম্পত্য সম্পর্কে বড় ধরনের চাপ তৈরি করে। এর সঙ্গে যদি অর্থনৈতিক প্রতারণা, পারিবারিক নির্যাতন বা বিদেশে নেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি যুক্ত হয়, তাহলে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।'

তিনি।বলেন, 'স্বামী যদি দীর্ঘদিন দেশে না থাকেন, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে এই বিয়ে কীভাবে টিকে থাকবে, সেটিই প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। অনেক পরিবার বিয়ের পর মেয়েটিকে বিদেশে পাঠানোর আশ্বাস দেয়। কিন্তু পরে দেখা যায়, তাকে শ্বশুরবাড়িতে রেখে দেওয়া হয়েছে। মেয়েরা এক-দুই বছর ধৈর্য ধরলেও একটা সময় আর পরিস্থিতি মেনে নিতে পারে না।'

তার মতে, ফোনে বা অনলাইনে পরিচয় এবং যোগাযোগের মাধ্যমে বিয়ে হলেও পরে স্বামী দেশে ফিরে এসে অনেক সময় স্ত্রীকে সংসারে গ্রহণ করেন না। তখন আইনি জটিলতার পাশাপাশি তৈরি হয় সামাজিক ও মানসিক সংকট।

বিদেশে জন্ম নেওয়া প্রজন্মও পড়ছে দ্বন্দ্বে

সিলেটের প্রবাসী পরিবারগুলোর আরেকটি বাস্তবতাও সামনে আসছে। বিদেশে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ-তরুণীদের অনেকে নিজের জীবন ও সংসার সেখানেই গড়তে চান। কিন্তু পরিবারের চাপে দেশে এসে বিয়ে করেন।

পাত্র-পাত্রীর জীবনযাপন, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় পার্থক্য থাকায় পরে তৈরি হয় অস্বস্তি।

যুক্তরাজ্য সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার তাজ উদ্দিন শাহ বলেন, 'বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের অনেকে বিদেশেই জীবন গড়তে চান, সেখানেই বিয়ে ও সংসার করতে চান। কিন্তু পারিবারিক চাপে অনেক সময় বাংলাদেশে এসে বিয়ে করেন। পরে দেখা যায়, ছেলে ও মেয়ের মধ্যে মানিয়ে নেওয়ার জায়গাটি তৈরি হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেই বিয়েটিও ভেঙে যায়।'

'লাল পাসপোর্ট' কি তবে বিয়ের গন্তব্য?

সিলেটের সমাজে প্রবাসী বিয়েকে ঘিরে তৈরি হওয়া আরেকটি প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে কেউ কেউ বিয়েকে অভিবাসনের মাধ্যম হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে ইউরোপ বা যুক্তরাজ্যে বসবাসরত পাত্রের সঙ্গে বিয়েকে অনেকে ভবিষ্যতে বিদেশ যাওয়ার সহজ পথ হিসেবে বিবেচনা করেন।

এই প্রত্যাশা থেকেই কখনো কখনো বিয়ের আগে পাত্রের প্রকৃত পরিচয়, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা, আর্থিক সক্ষমতা কিংবা বিদেশে তার বৈধ অবস্থান যাচাই করা হয় না।

পরে প্রতারণার শিকার হলে সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হয় অবিশ্বাস। আর সেই অবিশ্বাস শেষ পর্যন্ত গড়ায় বিচ্ছেদে।

নারীর আবেদন বেশি কেন?

সিলেট সিটি করপোরেশনের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, তালাকের আবেদনে নারীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেশি।

২০২৪ সালে পুরুষের তুলনায় ২৯টি বেশি তালাকের আবেদন করেছিলেন নারীরা। ২০২৫ সালে ব্যবধান আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৪১টিতে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নারীরা এখন আগের তুলনায় নিজেদের অধিকার সম্পর্কে বেশি সচেতন। দীর্ঘদিনের দাম্পত্য সংকট, ভরণপোষণের অনিশ্চয়তা, স্বামীর অনুপস্থিতি কিংবা নির্যাতনের মতো পরিস্থিতি মেনে নিয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রেই কমেছে।

তবে এর বিপরীতে সামাজিক চাপও রয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গেলে অনেক নারীকে নানা ধরনের সামাজিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।

বিয়ের আগে যাচাইয়ের তাগিদ

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু প্রবাসী পরিচয় বা বিদেশে বসবাসের কারণে কাউকে ভালো পাত্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বিয়ের আগে পাত্রের বৈবাহিক অবস্থা, বিদেশে তার বৈধতা, পেশা, আর্থিক সক্ষমতা, পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা যাচাই করা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিয়ের সিদ্ধান্তে ছেলে ও মেয়ের সম্মতি এবং মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

কারণ একটি বিয়ে শুধু দুই পরিবারের সামাজিক সম্পর্ক নয়। এটি দুইজন মানুষের ভবিষ্যৎ জীবন।

সিলেটে প্রবাসী-পাত্রের মোহ নতুন কিছু নয়। 

প্রবাসের অর্থ, সামাজিক মর্যাদা আর বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন বহু পরিবারকে এখনও আকৃষ্ট করে। কিন্তু সেই স্বপ্নের সঙ্গে যদি বাস্তবতা, সামঞ্জস্য আর পারস্পরিক সম্মতি না মেলে, তাহলে বিয়ের সোনালি স্বপ্নই একসময় হয়ে উঠতে পারে বিচ্ছেদের কারণ।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রবাসী মোহের এই অন্ধ দৌড় এবং বিয়েকে বিদেশ যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে দেখার প্রবণতা বন্ধ করা না গেলে সিলেটের পারিবারিক কাঠামোর ওপর এর চাপ আরও বাড়বে।

আরসি-০১

সিলেট প্রতিক্ষণ