মতামত



মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন

অক্টোবর / ০৫ / ২০২৬


সরকারি শিশু পরিবারের শিশুদের বর্তমান অবস্থা, সমস্যা, অধিকার, সরকারি সেবা ও ভবিষ্যৎ করণীয়


156

Shares


বাংলাদেশে সুবিধাবঞ্চিত ও এতিম শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে লালন-পালন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রশিক্ষণ এবং পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর সরকারি শিশু পরিবার পরিচালনা করে। সরকারি শিশু পরিবার শুধু আবাসিক প্রতিষ্ঠান নয়; এর মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুর সার্বিক বিকাশ এবং ভবিষ্যতে তাকে স্বনির্ভর নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।

সরকারি শিশু পরিবার পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি শিশু সদন/শিশু পরিবার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০০২, শিশু আইন ২০১৩ (সংশোধিত ২০১৮) এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি নির্দেশনা প্রযোজ্য। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী শিশু পরিবারে ভর্তি-পরবর্তী সেবা সাধারণত শিশুর ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষায় অধ্যয়নরত মেধাবী নিবাসীদের জন্য মেধাবৃত্তির ব্যবস্থাও রয়েছে। 

তবে সাম্প্রতিক জাতীয় মূল্যায়ন দেখিয়েছে যে বাংলাদেশে আবাসিক শিশু পরিচর্যা ব্যবস্থায় এখনও প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে এবং দারিদ্র্য অনেক শিশুকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে। ২০২৪ সালের জাতীয় মূল্যায়নে ১৫৭টি আবাসিক পরিচর্যা প্রতিষ্ঠান এবং ১০,৬০০-এর বেশি শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী বিকল্প পরিচর্যা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, পারিবারিক পুনঃএকীকরণ এবং শিশুর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার বিধান রয়েছে। সরকারি শিশু পরিবারকে আইনটি প্রাতিষ্ঠানিক বিকল্প পরিচর্যার একটি মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। 

শিশু একটি দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ। শিশুর নিরাপদ শৈশব, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, মানসিক বিকাশ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

দারিদ্র্য, পিতামাতার মৃত্যু, পারিবারিক ভাঙন, অসহায়ত্ব এবং অন্যান্য সামাজিক কারণে কিছু শিশু পরিবারে যথাযথ পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত হয়। এসব শিশুর জন্য রাষ্ট্রীয় বিকল্প পরিচর্যার প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশ সরকার সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারি শিশু পরিবার পরিচালনা করে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিশুদের আবাসন, খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। 

তবে বর্তমান শিশু অধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে শুধু প্রতিষ্ঠানে শিশুকে রাখা যথেষ্ট নয়। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, পারিবারিক সম্পর্ক, মতামত, ব্যক্তিগত পরিচয়, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

৩. সরকারি শিশু পরিবারের বর্তমান অবস্থা

সরকারি শিশু পরিবার সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক সেবা ব্যবস্থা। এর ব্যবস্থাপনা সরকারি নীতিমালা ও শিশু আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। 

শিশু পরিবারে শিশুদের জন্য সাধারণত নিম্নলিখিত সেবা দেওয়া হয়:  আবাসন, নিরাপদ আবাসিক পরিবেশ, নিয়মিত খাদ্য ও পুষ্টি,  প্রয়োজনীয় পোশাক শিক্ষা, বিদ্যালয়/কলেজে অধ্যয়ন, চিকিৎসা স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সহায়তা, বিনোদন, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, প্রশিক্ষণ, কারিগরি/বৃত্তিমূলক দক্ষতা, বৃত্তি, মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা, পুনর্বাসন, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বনির্ভরতা, সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী শিশু পরিবারে ভর্তি-পরবর্তী অন্যান্য সেবা শিশুর ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। 

৪. শিক্ষা ও মেধাবৃত্তি

সরকারি শিশু পরিবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হলো শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। ২০১৮–১৯ অর্থবছর থেকে সরকারি শিশু পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য মেধাবৃত্তি চালু করা হয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ৩২৪ জন এবং উচ্চতর পর্যায়ে ২২১ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে মেধাবৃত্তি দেওয়ার তথ্য সমাজসেবা অধিদপ্তর প্রকাশ করেছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এ খাতে মোট বাজেট ১ কোটি ৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বলে অধিদপ্তরের তথ্যের একটি সাম্প্রতিক পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে। 

শিক্ষার ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অগ্রাধিকারঃ ১. স্কুলে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা। ২. ঝরে পড়া প্রতিরোধ করা।৩. দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা। ৪. ডিজিটাল শিক্ষা ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ। ৫. ইংরেজি ও যোগাযোগ দক্ষতা উন্নয়ন। ৬. উচ্চশিক্ষায় উৎসাহ ও বৃত্তি বৃদ্ধি। ৭. বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি সহায়তা। 

৫. শিশু পরিবারের শিশুদের অধিকার

শিশু পরিবারে বসবাসরত শিশুরা অন্যান্য শিশুর মতোই অধিকারসম্পন্ন নাগরিক। শিশু আইন, ২০১৩-এর ৭০ ধারায় দায়িত্বে থাকা শিশুকে আঘাত, উৎপীড়ন, অবহেলা, বর্জন বা পরিত্যাগের মতো আচরণের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। শিশু পরিবারের শিশুদের যেসব অধিকার রয়েছে তার মধ্যে -- ১ বেঁচে থাকার অধিকার -.২ বিকাশের অধিকার- ৩ শিক্ষার অধিকার-  .৪ নিরাপত্তার অধিকার- .৫ মতামত প্রকাশের অধিকার- .৬ পারিবারিক সম্পর্কের অধিকার- 

৬. আইনগত অধিকার ও সুরক্ষা -  প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যা- শিশু আইন, ২০১৩-এর ৮৫ ধারায় বলা হয়েছে, যেসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুর জন্য পিতামাতাকেন্দ্রিক বা অ-প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়, তাদের জন্য সরকারি শিশু পরিবারসহ নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অর্থাৎ, আইনটির কাঠামো অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যা প্রয়োজনভিত্তিক বিকল্প, স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যেক শিশুর জন্য প্রথম পছন্দ নয়।

৭. বর্তমান প্রধান সমস্যা

৭.১ প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা-২০২৪ সালের জাতীয় মূল্যায়নে দেখা যায়, বাংলাদেশে আবাসিক শিশু পরিচর্যার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্য ও সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যা শিশুদের প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরিচর্যায় যাওয়ার কারণ হিসেবে কাজ করছে।  এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, কেবল দারিদ্র্যের কারণে একটি শিশুকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে তার পারিবারিক সম্পর্ক ও স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

৭.২ পারিবারিক পরিবেশের ঘাটতি- বড় আবাসিক প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের পরিবেশে অনেক শিশুকে একসঙ্গে রাখা হয়। ফলে শিশুর ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী যত্ন দেওয়া কঠিন হতে পারে। ২০২৫ সালের UNICEF গবেষণায় সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, বিচারক ও শিশু সুরক্ষা কর্মীদের মধ্যে পরিবারভিত্তিক পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ব্যাপক ঐকমত্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই গবেষণায় ছোট ও পরিবারসদৃশ আবাসিক ইউনিট গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। 

৭.৩ মানসিক ও মনোসামাজিক সহায়তার প্রয়োজন-অনেক শিশুই পিতামাতার মৃত্যু, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, দারিদ্র্য বা অন্যান্য প্রতিকূল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিশু পরিবারে আসে। তাই নিয়মিত—কাউন্সেলিং,মনোসামাজিক সহায়তা,  আচরণগত সহায়তা, ব্যক্তিগত কেস ম্যানেজমেন্ট প্রয়োজন।

জাতীয় মূল্যায়নের সুপারিশেও প্রতিটি শিশুর জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিচর্যা পরিকল্পনা ও কেসওয়ার্কার ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

৮. ১৮ বছর বয়সের পর পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ- শিশু পরিবারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ১৮ বছর বয়সের পর শিশুর ভবিষ্যৎ। শিশু পরিবার থেকে বের হওয়ার সময় একজন তরুণ/তরুণীর প্রয়োজন হতে পারে—উচ্চশিক্ষার সুযোগ; কারিগরি দক্ষতা; চাকরি; উদ্যোক্তা হওয়ার সহায়তা; থাকার ব্যবস্থা; ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা; জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্মনিবন্ধন; সামাজিক যোগাযোগ ও পরামর্শ; প্রয়োজনে মানসিক সহায়তা।তাই ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শেষ না করে aftercare/follow-up support ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

৯. সরকারি সেবা আরও কার্যকর করার প্রয়োজনঃ

৯.১ ব্যক্তিগত কেস ফাইল- প্রতিটি শিশুর জন্য পৃথক ডিজিটাল ও লিখিত কেস ফাইল থাকা উচিত। ফাইলে থাকবে: পারিবারিক তথ্য; স্বাস্থ্য;শিক্ষা; মানসিক ও সামাজিক অবস্থা; বিশেষ চাহিদা; আত্মীয়স্বজনের তথ্য; পুনঃএকীকরণের সম্ভাবনা; ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

৯.২ Individual Care Plan:  প্রতিটি শিশুর জন্য বার্ষিক ব্যক্তিগত পরিচর্যা ও উন্নয়ন পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

৯.৩ অভিযোগ ব্যবস্থাপনাঃ  শিশু যেন ভয় ছাড়াই অভিযোগ করতে পারে—এমন নিরাপদ ও গোপনীয় ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

৯.৪ শিশুদের অংশগ্রহণ ঃ শিশু পরিবারের ব্যবস্থাপনায় শিশুদের মতামত নেওয়ার জন্য—Child Parliament/Children's Committee/শিশু মতামত সভা জাতীয়ভাবে প্রণয়ন করা যেতে পারে।

১০. পরিবারভিত্তিক পরিচর্যার দিকে পরিবর্তনঃ  বাংলাদেশে বিকল্প পরিচর্যার ভবিষ্যৎ নীতিতে পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। ২০২৪ সালের জাতীয় মূল্যায়ন National Plan of Action on Alternative Care 2026–2030-এর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। এতে পরিবার বিচ্ছিন্নতা প্রতিরোধ, পরিবারভিত্তিক পরিচর্যা শক্তিশালী করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যাকে শেষ বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের গবেষণায় আত্মীয়ভিত্তিক পরিচর্যা, ফস্টার কেয়ার এবং পরিবারসদৃশ ছোট আবাসিক ইউনিটের বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

১১. ভবিষ্যৎ করণীয়ঃ  

স্বল্প মেয়াদি করণীয়- ১. প্রত্যেক শিশু পরিবারের বর্তমান শিশুদের তথ্য ডিজিটাল করা ২. শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়মিত করা  ৩, মানসিক স্বাস্থ্য ও কাউন্সেলিং সেবা চালু/শক্তিশালী করা। ৪. শিশু সুরক্ষা ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা। ৫ অভিযোগ বাক্স ও শিশুবান্ধব অভিযোগ ব্যবস্থা চালু করা। ৬. শিক্ষার মান ও বিদ্যালয়ে উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা। ৭. খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানো। ৮ কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি করা।

মধ্যমেয়াদি করণীয়-  ১. প্রতিটি শিশুর Individual Care Plan তৈরি।  ২.. কেসওয়ার্কার নিয়োগ/প্রশিক্ষণ। ৩. Family Tracing and Reunification ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।৪ আত্মীয়ভিত্তিক পরিচর্যার জন্য পরিবারকে আর্থিক ও সামাজিক সহায়তা দেওয়া। ৫. সীমিত পরিসরে মানসম্মত ফস্টার কেয়ার ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা। ৬.বড় প্রতিষ্ঠানকে ছোট পরিবারসদৃশ ইউনিটে রূপান্তর করা। ৭. ১৬–১৮ বছর বয়সী শিশুদের জন্য Career Planning চালু করা।

দীর্ঘমেয়াদি করণীয়-১. Family First, Institution Last নীতিকে বাস্তবায়ন করা। ২. পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার মূল কারণ—দারিদ্র্য, সামাজিক সংকট ও পারিবারিক অস্থিতিশীলতা—কমাতে সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো। ৩. ১৮ বছর পর অন্তত ২–৩ বছর Follow-up/Aftercare ব্যবস্থা রাখা। ৪. সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে চাকরি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ৫. শিশু পরিবারের জন্য জাতীয় মানদণ্ড নির্ধারণ করা। ৬. নিয়মিত স্বাধীন মনিটরিং ও মূল্যায়ন চালু করা। ৭. শিশুদের অংশগ্রহণকে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অংশ করা। 

১৩. সুপারিশ

ক. নীতিগত সুপারিশ ১. শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থকে সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। ২. দারিদ্র্যকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখিয়ে শিশুকে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যায় পাঠানো এড়াতে পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে।৩. প্রাতিষ্ঠানিক পরিচর্যার পাশাপাশি আত্মীয়ভিত্তিক ও পরিবারভিত্তিক বিকল্প পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ৪. সরকারি শিশু পরিবারকে পর্যায়ক্রমে আরও ছোট ও পরিবারসদৃশ পরিবেশে রূপান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। খ. শিশুর অধিকার সংক্রান্ত সুপারিশ ৫. শিশুর মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ করা। ৬. নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালু করা। ৭. নির্যাতন, অবহেলা ও হয়রানির বিরুদ্ধে Zero Tolerance নীতি কার্যকর করা। ৮. বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা নিশ্চিত করা। গ. শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ৯. উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি ও শিক্ষাঋণ/সহায়তা বাড়ানো। ১০. ১৫–১৮ বছর বয়সী শিশুদের জন্য Career Guidance চালু করা। ১১. সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা। ১২. ১৮ বছর পর অন্তত কয়েক বছর Follow-up support নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের সরকারি শিশু পরিবার ব্যবস্থা দেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আবাসন, খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও মেধাবৃত্তির মাধ্যমে সরকার শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। 

তবে আধুনিক শিশু অধিকারভিত্তিক ব্যবস্থায় লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু শিশুকে প্রতিষ্ঠানে রাখা নয়; বরং শিশুকে নিরাপদ, স্নেহপূর্ণ ও স্থিতিশীল পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া। শিশু আইন, ২০১৩-এর বিকল্প পরিচর্যা সংক্রান্ত বিধানও শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ এবং সম্ভব হলে পারিবারিক পুনঃএকীকরণকে গুরুত্ব দেয়। 

সাম্প্রতিক জাতীয় মূল্যায়ন ও ২০২৫ সালের গবেষণাগুলোও পরিবারভিত্তিক পরিচর্যা, আত্মীয়ভিত্তিক পরিচর্যা, ফস্টার কেয়ার এবং উন্নতমানের ছোট পরিবারসদৃশ আবাসিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। 

অতএব, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার মূল দর্শন হতে পারে—

“প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবার, মানসম্মত শিক্ষা, সুরক্ষিত শৈশব এবং স্বনির্ভর ভবিষ্যৎ।”

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি শিশু পরিবারগুলোকে শুধু আবাসিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং শিশুর অধিকার, বিকাশ, শিক্ষা, দক্ষতা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত সেবা কেন্দ্র হিসেবে উন্নত করা প্রয়োজন।


লেখক: উন্নয়নকর্মী 



ওয়াইএফ/০৩

মতামত