32
Sharesবিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি মৃত্যুর দিন রাতে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে যান। সঙ্গে ছিলেন বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই দীপ ও একজন তরুণী। বারে তখন চলছিল সাধারণ মিউজিক। হঠাৎ করে স্যাড মিউজিক চালাতে বলেন তাহসিফ।
এরপর ওই তরুণীকে তিনি বলেন, ‘কাজটা তুমি ঠিক করোনি।’ এর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে যান তারা। পুরোটা সময় তাহসিফের মন খারাপ ছিল।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য জানায়।
বারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাহসিফ এর আগেও একাধিকবার নারী নিয়ে ওই বারে গেছেন। একদিন সেখানে তিনি বারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে মিথ্যা পরিচয়ও দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানান, সেই রাতে তাহসিফের মন খারাপ ছিল তার সঙ্গে থাকা তরুণীর কারণে। ওই তরুণী অন্য একটি ছেলের সঙ্গে সময় কাটানোয় তাহসিফের মন খারাপ, একই সঙ্গে রাগও ছিল।
তিনি জানান, বারে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটানোর পর দীপকে সঙ্গে নিয়ে তাহসিফ যান টঙ্গী মাজার বস্তি এলাকায়। এলাকাটি মাদক সেবন ও মাদক বিক্রি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ওই স্থানে প্রায়ই অভিযান পরিচালনা করে। তাহসিফ ও দীপ মাদকসংক্রান্ত বিষয়ে সেখানে গিয়ে থাকতে পারেন, এমন কিছু ক্লু পাওয়া যাচ্ছে।
সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে পৌঁছান তাহসিফ, দীপ ও ওই তরুণী। তারা একটি মোটরসাইকেলে সেখানে যান। কিছুক্ষণ পর আরেকটি মোটরসাইকেলে করে পৌঁছান দীপ। পরে তিনজনকে একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতে দেখা যায়।
রেস্টুরেন্টের আরেকটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ ও ওই তরুণী লিফটের সামনে অপেক্ষা করছেন। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে পৌঁছান দীপ। এরপর তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে দেখা যায়। পরে মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে চলে যান তারা।
অন্য একটি সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে তাহসিফ সাউরির সঙ্গে ওই তরুণীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। একটি বিষয় কেন্দ্র করে সেদিন তারা বারে যান। এরপর তাহসিফ ওই তরুণীকে বলেন, ‘কাজটা তুমি ঠিক করোনি।’
তরুণীসহ একাধিকবার বারে গিয়েছিলেন তাহসিফ-দীপ
নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) সাবেক মেরিটাইম ক্যাপ্টেন হাসান হাবিব জাগো নিউজকে বলেন, ‘সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি শেষবার যেদিন রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন, সেদিন তার সঙ্গে দেখা হয়নি। তবে এর আগের তিন দিন তিনি একই এক তরুণীসহ রেস্টুরেন্টে এসেছিলেন। এ সময় তাদের সঙ্গে দীপ ও দীপের সঙ্গে একজন তরুণীও ছিলেন (সম্ভবত দীপের বান্ধবী)। তারা রেস্টুরেন্টে গান শুনেছেন, নাচানাচি করেন এবং বেশ আনন্দ করেন।’
তিনি বলেন, ‘আগের একদিন যাওয়ার সময় তাহসিফের সঙ্গে তার পরিচয় ও কথা হয়। তখন তাহসিফ নিজেকে ৭৭ লং কোর্সের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি বর্তমানে আন্ডারকভার হিসেবে একটি স্বনামধন্য গ্রুপে কাজ করছেন। তবে তাহসিফের দেওয়া পরিচয়কে মিথ্যা বলে মনে হয়েছিল তার। কারণ, কেউ আন্ডারকভার হিসেবে কাজ করলে সাধারণত নিজেকে আন্ডারকভার পরিচয় দেন না।
ওই সময় তাহসিফ রেস্টুরেন্টের গান নির্বাচন ও পরিবেশের প্রশংসা করেন। তারা গান উপভোগ করেন। এরপর তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে বিদায় নেন বলে জানান ম্যানেজার।
শেষবার তাহসিফ রেস্টুরেন্টে যাওয়ার দিন স্যাড মিউজিক বাজানোর অনুরোধ করেছিলেন কি না, জানতে চাইলে হাসান হাবিব জানান, সেদিন তিনি রেস্টুরেন্টে ছিলেন না। সাধারণত রেস্টুরেন্টে টেলিভিশনে প্রচারিত গানই বাজানো হয়। মিউজিক পরিচালনার বিষয়টি তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেন।
বারে থেকেই বস্তি এলাকায় যান তাহসিফ-দীপ
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলছেন, রাতে বার থেকে বেরিয়ে তাহসিফ ও দীপ মোটরসাইকেল চালিয়ে টঙ্গী মাজার বস্তি এলাকায় যান। ফুটেজ অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর রাত ১২টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে মাজার রোড দিয়ে বস্তিতে প্রবেশ করেন তাহসিফ ও দীপ। অন্য একটি ফুটেজে দেখা যায়, দুজন করে আরোহী নিয়ে তিনটি মোটরসাইকেল একসঙ্গে বস্তিতে ঢুকছে। এর মধ্যে প্রথম মোটরসাইকেলে তাহসিফ একাই ছিলেন। সেখানে তাহসিফ চিল্লাচিল্লি করেন। তখন কিছু মাদক কারবারি আসেন।
এর বেশ কিছুক্ষণ পর কয়েকজন ধাওয়া করলে সবাই যে যার মতো পালিয়ে যান। দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, তাহসিফ নদীতে পড়ে যান এবং দীপ পিলারের পাশে লুকিয়ে থাকেন। এরপর টহলরত পুলিশ সদস্যরা তাকে জিজ্ঞাসা করলে সে জানায়, লেফটেন্যান্ট তাহসিফের সঙ্গে তিনি এসেছেন। এরপর দীপকে পুলিশ সদস্যরা বলেন, দ্রুত এখান থেকে চলে যেতে। দীপ বের হওয়ার রাস্তা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। বেশ কিছু সময় পরে দীপ মূল সড়ক খুঁজে পাওয়ার পর সেখান থেকে চলে আসেন মোহাম্মদপুরের বাসায়। তবে সেখানে তাহসিফকে না খুঁজে একাই কেন দীপ বাসায় ফিরলেন সেটি সন্দেহ করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
সেই রাতে বস্তিতে ধাওয়া দেওয়া পুলিশ সদস্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করবেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনাস্থলে কয়েকজন তাদের ধাওয়া করলে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। আর তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। তবে ধাওয়াকারী কারা, তাদের সঙ্গে তাহসিফ বা দীপের কোনো বিরোধ ছিল কি না, কিংবা নদে ঝাঁপ দেওয়ার পর তাহসিফের সঙ্গে কী ঘটেছিল- এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। রিমান্ডে দীপকে সামগ্রিক বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
খোঁজ জানা যায়, তুরাগ নদঘেঁষা ও ঢাকা-গাজীপুরের সংযোগস্থলে অবস্থিত হাজি মাজার বস্তি এবং আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলছে। নির্জন পথ, নদীতীরবর্তী অবস্থান ও অপরাধী চক্রের প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন সেখানে।
সেই রাতে টঙ্গী মাজার বস্তি এলাকায় পুলিশের টহল ছিল কি না জানতে চাইলে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ওই এলাকায় পুলিশের নিয়মিত টহল থাকে এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা ডিউটিতে থাকেন।’
সেই তরুণী রিমান্ডে
তাহসিফ সাউরির সঙ্গে যে তরুণীকে উত্তরার একটি বারে ঢুকতে এবং বের হতে দেখা গিয়েছিল, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রোববার (১ নভেম্বর) চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, সিসিটিভি ফুটেজে গত ২৭ অক্টোবর রাতে উত্তরার একটি রেস্তোরাঁয় তাহসিফ সাউরির সঙ্গে ওই তরুণীকে দেখা যায়। এরপর তারা আরও কয়েক জায়গায় যান। তাদের মধ্যে মোবাইলে কথা হয়।
রিমান্ড শুনানিতে প্রসিকিউটর শামছুদ্দোহা সুমন বলেন, আগে রিমান্ডে থাকা অপর আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে আসামির তথ্য ক্রসচেক বা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামির সর্বোচ্চ রিমান্ডের প্রার্থনা করছি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বারে প্রবেশের আগে তরুণীকে কোন জায়গা থেকে তাহসিফের সঙ্গে দেখা হয়েছে, সেখানে কোনো কথাবার্তা হয়েছিল কি না, বারে বসে কী ধরনের আলাপ হয়েছে, বার থেকে বেরিয়ে তাহসিফ ও তরুণীর মধ্যে কী ধরনের কথোপকথন হয়েছে- সবকিছু রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যাবে এবং সবকিছু পরিষ্কার হতে পারে।
রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে দীপ
দীপ চার দিনের রিমান্ডে আছেন। নৌ-পুলিশের একটি সূত্র বলছে, রিমান্ডে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে দীপ। তবে সেগুলো সত্য কি না তা যাচাই করতে হচ্ছে। কারণ, ঘটনার প্রথমে দীপ যে ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন পরে তা উল্টে যায়। সেজন্য দীপ যা কিছু বলবে সবকিছু সত্য হবে এমনটি নাও হতে পারে। তবে রিমান্ডে থাকা অবস্থায় সে যাতে সত্য বয়ান দেয় সেজন্য পুলিশ চেষ্টা করছে।
ময়নাতদন্তের নমুনা পরীক্ষায় মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান
শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর কারণ জানতে ময়নাতদন্তের সময় অর্গান নমুনা হিসেবে তার পাকস্থলী ও কিডনি সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ভিসেরা ও রক্তও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্যও নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফরেনসিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, মরদেহটি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পানির নিচে ছিল। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত নির্ভুলভাবে মৃত্যুর কারণ বলা যাবে না।
ওই কর্মকর্তা বলেন, তাহসিফ বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। সাধারণত তার সাঁতার জানার কথা। সে ক্ষেত্রে তিনি এমন অবস্থায় পানিতে পড়েছিলেন কি না, যেখানে তার সাঁতার কাটার সক্ষমতা ছিল না, সেটিও বিবেচনায় আসছে। তবে এসব তথ্য সঠিক কি না, তা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
রক্ত, পাকস্থলী ও কিডনির নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে ওই কর্মকর্তা বলেন, মৃত্যুর কারণ জানতেই এসব নমুনা পরীক্ষা করতে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া তিনি মাদক সেবন করে থাকলে বা কোনো ধরনের নেশাজাতীয় বস্তু গ্রহণ করে থাকলে পরীক্ষার মাধ্যমে তা জানা যেতে পারে। শনিবার প্রতিবেদন আসার কথা রয়েছে।
জাগো নিউজ/ওয়াইএফ-০১