সিলেট প্রতিক্ষণ



নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই / ০৭ / ২০২৬


চা উৎপাদন সিলেটে, দাম ঠিক হয় চট্টগ্রামে


84

Shares

দেশের সবচেয়ে বেশি চা উৎপাদন হয় সিলেট বিভাগে। কিন্তু সেই চায়ের দাম কত হবে, কোথায় বিক্রি হবে, কোন বাজারে যাবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয় শত শত কিলোমিটার দূরের চট্টগ্রামে। আট বছর আগে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে নিলাম কেন্দ্র চালু হলেও সিলেটের চা বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ আজও কার্যত চট্টগ্রামের হাতেই রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে উৎপাদিত ৯ কোটি ৪৯ লাখ ৩০ হাজার কেজি চায়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এসেছে সিলেট বিভাগ থেকে। এর মধ্যে একা মৌলভীবাজারই উৎপাদন করেছে মোট চায়ের ৪৭ শতাংশ। হবিগঞ্জের অবদান ১৬ শতাংশ এবং সিলেট জেলার ৪ শতাংশ।

তবে উৎপাদনের কেন্দ্র হলেও নিজেদের অঞ্চলে উৎপাদিত চা বিক্রির জন্য এখনো বাগান মালিকদের নির্ভর করতে হচ্ছে চট্টগ্রামের নিলাম কেন্দ্রের ওপর। কারণ শ্রীমঙ্গলের নিলাম কেন্দ্র বড় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা অর্জন করতে পারেনি।

চলতি মৌসুমে ২৯ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত নয়টি নিলামে বিক্রি হয়েছে ১ কোটি ৭৬ লাখ ৮৬ হাজার ৩২৮ কেজি চা। সেখানে প্রতি কেজির গড় দাম পাওয়া গেছে ২৭২ টাকা ১০ পয়সা।

একই সময়ে শ্রীমঙ্গলে অনুষ্ঠিত আটটি নিলামে বিক্রি হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৫ কেজি চা। প্রতি কেজির গড় মূল্য ছিল ২৫৩ টাকা ৯১ পয়সা।

অর্থাৎ বিক্রির পরিমাণে শ্রীমঙ্গলের অংশ চট্টগ্রামের তুলনায় দেড় শতাংশেরও সামান্য বেশি। একই সঙ্গে দামেও পিছিয়ে থাকায় অধিকাংশ বাগান মালিক এখনো চট্টগ্রামকেই বেশি লাভজনক বাজার হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

চা খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্র প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার অন্যতম কারণ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। সেখানে এখনো পর্যাপ্ত ও আধুনিক ওয়্যারহাউজ নেই। পাশাপাশি অর্থ লেনদেনের বিদ্যমান পদ্ধতিও বড় ক্রেতাদের জন্য সুবিধাজনক নয়।

এ ছাড়া দেশের বড় বড় চা ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় এবং ক্রয়-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বেশির ভাগই ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থান করেন। ফলে নিয়মিত শ্রীমঙ্গলে গিয়ে নিলামে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা এখনো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) মোহাম্মদ মোয়াজ্জম হোসাইন বলেন, স্থানীয় মানুষ ও উৎপাদনকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার শ্রীমঙ্গলে নিলাম কেন্দ্র চালু করেছে। তবে এসব কেন্দ্র কার্যকরভাবে পরিচালনা করা এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের আকৃষ্ট করার দায়িত্ব বেসরকারি উদ্যোক্তাদের।

তিনি বলেন, “ধারাবাহিকভাবে অবকাঠামো উন্নয়ন, মানসম্মত চা সরবরাহ এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করা গেলে ধীরে ধীরে নতুন নিলাম কেন্দ্রগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠবে।”

তবে তিনি স্বীকার করেন, আট বছর পরও শ্রীমঙ্গলের বিক্রির পরিমাণ মোট বাজারের খুবই সামান্য অংশে সীমাবদ্ধ থাকাটা হতাশাজনক।

চট্টগ্রামের একচেটিয়া নিলাম ব্যবস্থার বিকল্প গড়ে তোলার দাবিতে প্রায় দেড় দশক আগে মৌলভীবাজারে আন্দোলন শুরু করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চা বাগান মালিকরা। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৪ মে শ্রীমঙ্গলে দেশের দ্বিতীয় চা নিলাম কেন্দ্র চালু হয়। এর পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে টি প্ল্যান্টার্স অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।

চলতি মৌসুমে (এপ্রিল-মার্চ) প্রতি বুধবার মিলিয়ে এখানে মোট ৪৭টি নিলাম হওয়ার কথা থাকলেও উৎপাদনের কেন্দ্র হয়েও শ্রীমঙ্গল এখনো দেশের চা বাণিজ্যের মূল বাজার হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে সিলেটের পাহাড়ে চা উৎপাদিত হলেও তার বাজার ও মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা এখনো রয়ে গেছে চট্টগ্রামের হাতেই।

আরসি-০১

সিলেট প্রতিক্ষণ